রক্তকরবী-মৃত্যুর হাতছানি

চারিদিকে উজ্জ্বল রোদ থকথক করছে, রাস্তায় একা একা কলেজ পড়ুয়া পথিক হেটে চলছে। ভাটি অঞ্চলের রাস্তা দু’ধারে তরুছায়া একেবারেই কম, ছায়া বলতে অনেক্ষণ হাটার পর ছোট গুল্ম জাতীয় রক্তকরবী। পরিশ্রান্ত পথিক কোন উপায় না দেখে রক্তকরবীর আধো ছায়া আধো রোদে ঝিলিমিলি দূর্বাঘাসে বসে বিশ্রাম করছে। পাশেই ছাগল ছানা রক্তকরবী গাছের ছাল তুলে দ্বিপ্রহরের ভোজন সেরে নিচ্ছে। প্রায় আধাঘণ্টা, ক্লান্ত পথিক এই দৃশ্যটি মস্তিষ্কে ধারণ করছে। এক পর্যায়ে ছাগল-ছানাটি ক্লান্ত পথিকের মত নরম দূর্বাঘাসে শুয়ে গেলো কিন্তু ক্লান্ত পথিক তখনো বুঝে উঠতে পারেনি কি ঘটতে যাচ্ছে। চোখের পলকেই অনেকটা সময় কেটে গেলো ইতোমধ্যে ছাগল-ছানাটি নিস্তেজ নিথর দেহ নিয়ে পড়ে আছে। কিন্তু পথিক তখনও কিছুই বুঝতে পারেনি কি হল! পথিক ভাবতে ভাবতে আবারো হাটতে শুরু করলো কিন্তু কোন কিছুতেই পথিকের মন স্থির হচ্ছে না। পথিক কৌতূহল নিয়ে তার শিক্ষকের দ্বারস্থ হয়ে ঘটনাটির বিস্তারিত বর্ণনা দিলো। শিক্ষক নীরবে কিছুক্ষণ শ্রবণ করলেন। তাঁর প্রথম ব্যাখ্যা ছিল ছত্রাকের টক্সিসিটি, তারপর ভ্রু কুঁচকে বলতে লাগলেন গাছটা ছিল রক্তকরবী। বুঝেছি ছাগল ছানাটি রক্তকরবীর বিষক্রিয়ায় মারা গেছে।

জন্মের পর থেকেই জেনেছি গাছ মানুষের বন্ধু হয়ে এদের জীবন উৎসর্গ করে দেয় মানব কল্যাণে। কিন্তু রক্তকরবীর আচরণ ঠিক তার বিপরীত। এদের পাতা,বাকল,ফুল ও ফল সহ উদ্ভিদের প্রতিটি অংশ বিষাক্ত। এই উদ্ভিদ থেকে নির্গত লেটেক্স সেবন করলে মৃত্যু নিশ্চিত। সৌন্দর্যের কারণে রক্তকরবী ও শ্বেতকরবী সাহিত্যে স্থান দখল করে নিয়েছে। TESS অনুসারে ২০০২ সালে আমেরিকায় ৮৪৬ টি বিষক্রিয়ার ঘটনা লিপিবদ্ধ করা হয়। যার মধ্যে ৮০ ভাগ ছিল রক্তকরবীর বিষক্রিয়া। এছাড়া ঘাসে মিশে যাওয়া শুকনো করবী পাতা বা শাখা খেয়ে গবাদি পশুর বিষক্রিয়া হয়ে মৃত্যু বরন করে। এই উদ্ভিদে প্রাপ্ত কেমিক্যাল Oleandrin যা Cardiac glycosides হিসেবে কাজ করে। সেল মেমব্রেনে সোডিয়াম পটাশিয়াম পাম্পের সাহায্যে পটাশিয়াম আয়নকে ভিতরে প্রবেশ ও সোডিয়াম আয়নকে বাহিরে বের করতে সাহায্য করে। কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড এই পাম্পকে বন্ধ করে দেয় ফলে সোডিয়াম বেরিয়ে যেতে পারেনা ও ইন্ট্রাসেলুলার(কোষাভ্যন্তরে) সোডিয়ামের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়ে প্রাণীদেহে মারাত্মক বিষক্রিয়া তৈরি করে এবং মৃত্যুবরণ করে। খলনায়ক Oleandrin নামক কেমিক্যালের উপস্থিতির কারণেই এই প্রজাতির নামকরণ করা হয় Oleander, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকের নন্দিনী অনেকেরই স্বপ্নের চরিত্র হলেও বাস্তবে রক্তকরবী প্রাণীদেহের জন্য খলনায়কের ভূমিকা পালন করে।

এই উদ্ভিদ ক্ষতিকর হলেও এদের পুষ্প ও ইনফ্লোরোসেন্স আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিবে। এতে প্রাপ্ত লেটেক্স ও পত্র নির্যাস প্রাণীদেহের জন্য যতই হুমকি স্বরূপ হোক না কেন সে অক্সিজেন সরবরাহ করতে কিন্তু সামান্যতম কৃপণতা করে না। তাইতো উনিশ শতকে টেক্সাসের গ্লাভেস্টন দ্বীপে প্রলয়ঙ্করী হ্যারিকেনের পর সেখানে প্রচুর রক্তকরবী রোপণ করা হয়েছিলো এবং এখন সেই এলাকায় এদের এতটাই দাপট প্রায় সারা বছর প্রকৃতি গোলাপি লিপস্টিক মেখে থাকে। শুধু তাই নয় সেখানকার অধিবাসীদের আত্মহত্যার জন্য প্রিয় উদ্ভিদ এই রক্তকরবী। বর্তমানে এই উদ্ভিদের নামানুসারেই গ্লাভেস্টন দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে ওলেন্ডার সিটি (Oleander City), প্রতি বসন্তে সেখানে বার্ষিক ওলেন্ডার উৎসব হয়।
কিছু কিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণী যেমন Syntomeida epilais কে রক্তকরবীর বিষক্রিয়া স্পর্শ করতে পারেনা, এই সব প্রাণীরা এই উদ্ভিদের পাতা ও কাণ্ডের কচি বাকল খেয়ে জীবন ধারণ করে। তবে বেশীর ভাগ পোকা মাকড় এই উদ্ভিদের ছায়াও মাড়ে না শুধুমাত্র বিষক্রিয়ার জন্য। আমরা যদি একে বাগানে স্থান দেই তাহলে এর পোকা মাকড় দমনের জন্য সামান্যতম বেগ পেতে হয় না। শুধু বাচ্চা ও পোষা প্রাণী দের সাবধানে রাখলেই চলে।তবে এদের পরাগায়নের জন্য ভিজিটর হিসেবে পোকামাকড়ের উপস্থিতি একান্ত অপরিহার্য। সে ক্ষেত্রে এরা প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করে। এদের চমৎকার রঙের পাপড়ি ও করলা গুলোকে ব্যবহার করে লাইভ বিজ্ঞাপন দেয় যেন পলিনেটর দূর থেকে দেখে আকৃষ্ট হয়ে এক ফুল থেকে অন্য ফুলের গর্ভমুন্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়ার পর প্রতারিত হয় কারণ সামান্য তম নেকটার প্রতারক রক্তকরবীর ফুলে পাওয়া যায় না বেচারা পোকা-মাকড় নিরাশ হয়ে ফিরে যায় কিন্তু এতক্ষণে তার পরাগায়ন কর্ম সম্পন্ন হয়ে যায়। এই কারণেই রক্ত করবী পলিনেটর পায় না বললেই চলে। বিজ্ঞানীদের ধারনা এদের পুষ্পে (toxic Oleander nectar) যদি নেকটার থাকতো তাহলে অনেক মৌমাছিরা এদের নেকটার খেয়ে মারা যেতো অথবা এই বিষক্রিয়া মধুতে কন্ট্রামিনেট(honey contamination) করতো যা মানবদেহের জন্য হুমকিস্বরূপ হতো। কি চমৎকার ন্যাচারাল প্রটেকশন(!) রক্ত করবী (Oleander) উষ্ণ সাবট্রপিক্যাল অঞ্চলের রাস্তা বাগান বাড়ির আঙ্গিনায় শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে প্রচুর রোপণ করা হয়। উষ্ণ আবহাওয়া পেলে প্রায় সারা বছর ফুল ফোটে ও গোলাপ পাপড়ি সদৃশ ফুলে সামান্য মৃদু সুবাসও পাওয়া যায়।

প্রতারক,খলনায়ক বলে একে যতই গালি বা অপবাদ দেন না কেন এর কিছু গুন অবশ্যই আছে। প্রথমেই উল্লেখ করেছি আমাদের জন্য বিষ তৈরি করলেও অক্সিজেন তৈরিতে সামান্যতম তালবাহানা নেই। N. oleander প্রজাতি থেকে ক্যান্সারের ঔষধ তৈরি করার জন্য বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, গবেষণা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে এখন শুধু মানবদেহে প্রয়োগের অপেক্ষা। তবে সেদিন হয়ত বেশী দূরে নয় সবাইকে অবাক করে দিয়ে রক্তকরবী তার নামের আগে ব্যবহার করা প্রতারক সহ অন্য সব নেতিবাচক শব্দগুলি মুছে দিতে সক্ষম হবে।
টীকা:
(১)TESS– Toxic Exposure Surveillance System
(২)Syntomeida epilais–এক প্রকার পোকা যারা উড়তে সক্ষম।

ছবির বিষয়বস্তু:
রক্তকরবীর ফুল ও পাতা আমার বাগান থেকে ধারণকৃত।

error: Content is protected !!