পরিবেশবিদ মিজানুর রহমান ভূঁইয়ার সাক্ষাৎকার

  • MRB with dr. reza
    Mizanur Rahman Bhuiyan (R) and Dr. Ali Reza (L)
  • MRB
    Mizanur Rahman with the Nature Lovers

আপনার ছেলেবেলা সম্পর্কে কিছু বলুন। তখনকার পরিবেশ-প্রকৃতি কেমন ছিল ?

মি..ভূঁইয়া – আমার জন্ম (১৯৫৬, এপ্রিল ২৮) হয় আমার মাতুলালয়ে (গ্রাম- ছতুরা শরীফ, থানা- আখাউড়া, জেলা-ব্রাহ্মণবাড়ীয়া)। আর আব্বা তখন চাকুরী করতেন বরিশাল শহরে। তাই আমার ছেলেবেলা কেটেছে বরিশাল শহরে (রঞ্জন কুঞ্জ, কালি বাড়ী রোড), আর বছরে এক মাস ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার ঐ ছতুরা শরীফ গ্রামে। শৈশব ও কৈশরে দেখা গ্রাম বাংলার শিশির সিক্ত রঙ্গীন শোভা, যোজন বিস্তৃত ফসলের মাঠ, গ্রামের লোকজনের প্রাণখোলা হাসি, বিকেলে মামা বাড়ীর উঠানে লোকজনের হুকো হাতে আড্ডা, আমগাছে বসে কাচা আম ছিলে খাওয়ার স্বাদ আর কনি জাল ছড়িয়ে চাড়ার কৈ মাছ তোলার আনন্দ আমার ঐ কচি তরুণ মনে এমন করে স্থান করে নিয়েছিল, যা আজও স্মৃীতিপটে অম্লান হয়ে আছে। ক্ষেত থেকে রাঙ্গা আলু তুলে কাঁচা খাওয়ার অভিজ্ঞতা যার নেই, তার কাছে এ অভিজ্ঞতার কথা বলাই বৃথা। মেঠো গাছ-গাছলীর মিষ্টি গন্ধ, কাঁচা মটরশূটির মিষ্টি স্বাদ, আর বিলের ধারে সূর্যের অস্ত যাওয়ার দৃশ্য – সেতো এখন শুধূ কল্পনাতেই সম্ভব। বর্ষায় বিলের মাঝখানে নৌকা গেড়ে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা না থাকলে তার আনন্দের কথা বলে শুধু সময়ই নষ্ট হবে। আজো বুভূক্ষ হৃদয় বার বার খুঁজে মরে সেই স্মৃীতির পাতায়, সেই দৃশ্য, সেই খানে – কিন্তু হায়, সবই আছে আগের মতই কিন্তু কি যেন নাই – কিছু একটা হারিয়ে গেছে, সাথে করে নিয়ে গেছে সেই অপার্থিব পবিত্র সৌন্দর্য্য আর প্রাণভরা অনাবিল আনন্দ।

আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন

মি.র.ভূঁইয়া – আমার শিক্ষা জীবন শুরু হয় বরিশাল শহরে প্রভাতী ক্যাথলিক মিশনারী স্কুল (১৯৬২) ও পরবর্তীতে বি.এম. স্কুলে (১৯৬৭)। সেখান থেকে আব্বার রিটায়ারমেন্টের পর ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার অন্নদা সরকারী হাই স্কুল (১৯৭১) ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সরকারী কলেজে (১৯৭৬)। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে (বন্যপ্রাণী) (১৯৮১)।

আপনি বহু বছর যাবৎ নটরডেম কলেজে অধ্যাপনা করছেন আপনার অধ্যাপনা জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু বলুন

মি..ভূঁইয়া – আমি ১৯৮৩ সনের ৮ই আগষ্ট নটর ডেম কলেজে শিক্ষকতা শুরু করি। তখনকার প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন ফাঃ যে. এস. পিশোতো, সি.এস.সি.। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় আমি ১৯৮৪ সনের ২৯শে আগষ্ট শুরু করি নটর ডেম নেচার ষ্টাডি ক্লাব এবং পরবর্তীতে এ ক্লাবের সক্রীয় সদস্যদের নিয়ে শুরু হয় নেচার ষ্টাডি সোসাইটি অব বাংলাদেশ(১৯৯৬) (NSSB)| আমরা নেচার ষ্টাডি ক্লাবের নীতি নির্ধারণ করি ১৯৮৪ সনে যা এতদিনের অভিজ্ঞতা ও নীরিক্ষণের ফলশ্রুতিতে বর্তমান রূপ লাভ করেছে এবং যার উপর ভিত্তি করেই নেচার ষ্টাডি সোসাইটি গঠন করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের কলেজে লেখাপড়ার পাশাপাশি সবসময়ই সহ-শিক্ষা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা হয়। যার ফলে বহু ছাত্রের সাথে একান্তে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। আর এ নির্দিষ্ট বয়োসন্ধিতে তাদের মনোভাব সম্পর্কেও আমার বেশ ধারণা হয়েছে যে তারা এ বয়সে কি চায় বা কি সম্পর্কে চিন্তা করতে ভালবাসে। আমার এ নীরিক্ষণে এ সত্যটি প্রমাণিত হয়েছে যে, তাদেরকে কোন বিষয়ে মনোযোগী করতে পারলে তারা সে বিষয়টিকে সারা জীবনের জন্য ধরে রাখতে পারে এবং তা শুধু এ বয়েসেই সম্ভব। কারণ, এর আগেও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে অবস্থিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণিতত্ত্ব সমিতি-এর সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং এর পত্রিকা পরিবেশ পরিচিতি-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছি। তাতে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তাতে দেখা যায়, ঐ বয়েসে কোন কিছুকে আয়ত্ব করে ধরে রাখার চেয়ে নিজের ক্যারিয়ার নিয়েই ছেলে-মেয়েরা বেশী চিন্তিত থাকে, যা কলেজ জীবনে থাকে না।

তাই আমার কলেজে ক্লাব প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে ছাত্রদেরকে প্রকৃতি সংরক্ষণ মনষ্ক করে গড়ে তোলার পেছনে আমি শ্রম দিতে শুরু করি এবং বিপুল পরিমান সময় অতিবাহিত করি। যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান লেখক শেখর রায়ের মত আরও অসংখ্য প্রতিভা বিকাশ লাভ করেছে, যা হয়তো লুকিয়েই থাকতো এবং অজ্ঞাত রয়ে যেতো।

আমি সবসময়ই ক্লাসে লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্রদেরকে পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া সর্বশেষ বা সর্বাধুনিক ঘটনাসমূহের দিকে আকৃষ্ট করেছি এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের গুরুত্বের দিকে তাদেরকে মনোযোগী করে তোলার চেষ্টা করেছি। আর ক্লাবে এমন সব ট্রেনিং প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করেছি যাতে তারা ভবিষ্যতেও কোন চিন্তা করলে তা পরিবেশ বান্ধব মনোভাবের সাথেই কল্পনা বা পরিকল্পনা করে। তাবে এখানে আমার ২৩ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, ছাত্রদেরকে ঠিকমত উৎসাহীত করতে পারলে, তাদের পিছনে শ্রম, মেধা ও সময় দিলে এবং সর্বোপরি তাদের ব্যক্তিগত আর্থ-সামাজিক কাঠামোর রূপায়ণের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বা পরামর্শ দিলে – তাদেরকে বিজ্ঞান-মনষ্ক বা প্রকৃতি-সংরক্ষণ মনষ্ক করে গড়ে তোলা সম্ভব।

আমরা জানি যে আপনি নটরডেম নেচার স্টাডি ক্লাব ও নেচার স্টাডি সোসাইটি অব বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা এগুলি সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন

মি..ভূঁইয়া – ইতিপূর্বের আলোচনা থেকে আপনারা জানতে পেরেছেন যে, নটর ডেম নেচার ষ্টাডি ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সনের ২৯শে আগষ্ট এবং নেচার ষ্টাডি সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৯৬ সনে ৩০শে আগষ্ট। এ উভয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রায় একই কিন্তু এদের ক্ষেত্র ও পরিসরে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে প্রকৃতি-সংরক্ষণ মনষ্ক করে গড়ে তুলতে ক্লাবটি কাজ করে থাকে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা এলাকা ভিত্তিক এর অবস্থান। কিন্তু সোসাইটি (সমিতি) সমগ্র দেশ এবং বিদেশেও কাজ করার উপযোগী করে তৈরী। আর এটি শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আপামর জনসাধারণ এর সদস্য হতে পারে এবং এর মাধ্যমে পবিবেশ-বান্ধব যেকোন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে এ উভয় সংস্থার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে –

প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিষয়ক বিভিন্ন তত্ত্ব ও তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করা, সদস্যদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃতি-সংরক্ষণ মনষ্ক করে গড়ে তোলা এবং জনগণের মাঝ পরিবেশ-বান্ধব বা পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক গণচেতনা জাগিয়ে তোলা। এ উভয়ের নিয়মিত কার্যক্রম প্রায় একই, যেমন – দৈনিক প্রাকৃতিক-সংবাদ সংগ্রহ করা, সাপ্তাহিক সভা বা বক্তৃতা, পাক্ষিক ফিল্ড ট্রিপ বা প্রকৃতি নিরীক্ষণ, মাসিক সভা ও দেয়ালিকা  প্রকাশ বা বক্তৃতা, বাৎসরিক সাধারণ সভা ও পূনর্মিলনী, সেমিনার বা সিম্পোজিয়া ও বার্ষিক প্রতিবেদন বা পত্রিকার প্রকাশনা। এসব প্রতিটি বিষয়ে বিশেষ কমিটি সর্বদা কর্মরত থাকে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি আসে একজন পরিবেশবিদ হিসেবে আমাদের বলবেন কি কোন্‌ কোন্‌ প্রজাতির পাখি বাংলাদেশে আসে এবং তারা কোন কোন দেশ থেকে এখানে আসে ?

মি.র.ভূঁইয়া – আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে আমাদের দেশ একটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বিশ্বের সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ (Delta)| একে Gangetic Delta নামেও ডাকা হয় কারণ, গঙ্গা নদীর অববাহীকা বাহিত পলি থেকেই প্লিষ্টোসিনী ভূ-তত্ত্বীক যুগে এর সৃষ্টি। এর আগে এটি বঙ্গোপসাগরেরই বেলাভূমি ও চরসমৃদ্ধ অঞ্চল ছিল যার প্রান্তে ছিল বর্তমান সুন্দরবনেরই আদি অবস্থান। এ মানগ্রুভ বনের (Mangroove forest) বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এটি সাগরের ভিতরে চর তৈরী করে করে স্থলভাগকে উন্নত করে। তাই আদি বাংলাদেশ বা পুরো বঙ্গের দক্ষিনে পুরো সমুদ্র সৈকত জুড়ে ছিল সুন্দরবনের অবস্থান। আজ যা কমতে কমতে সুন্দরবন নামক পকেট ফরেস্টে পরিণত হয়েছে।

আদি মানগ্রুভ বন এবং এর বিপুল পরিমান প্রাকৃতিক সম্পদ, তদুপরি গাঙ্গেয় অববাহীকা হওয়ার সুবাদে আমাদের এ বিশাল ব-দ্বীপটি চিরকালই চিরসবুজের লীলাধাম এবং অসংখ্যা দেশী বা বিদেশী প্রাণী ও পাখিদের বিচরণ ও আবাসভূমি। তাই বহুযুগ আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা এখানে আসে বছরের একটা বিশেষ সময় কাটাতে। আবার অনেক সময় দেখা গেছে, সময় কাটাতে কাটাতে তারা হয়ে গেছে এদেশেরই পাখি – এর জীববৈচিত্রের অংশ।

এদেশে বর্তমানে প্রায় ৬০০-এরও বেশী প্রজাতির পাখি আছে (Khan,`81)| ইতিপূর্বে আরও ছিল – বর্তমানে বিলুপ্ত। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে বিভিন্নজন গবেষণা করেছেন এবং তাদের ধারণা এখানে ৬০০ – ৬৫০ প্রজাতির পাখি বিচরণ করে থাকে যাদের একটা অংশ পরিযায়ী বা অতিথী পাখি। তাদের অনেকেই বিদেশী পাখি এবং আন্তর্জাতিক পরিযানবৃত্তির সদস্য আবার অনেকে আমাদেরই দেশের পাখি কিন্তু বিভিন্ন সুবিধার্থে দেশের ভিতরেই বিভিন্ন সময় স্থান পরিবর্তনকারী। প্রথমোক্ত পাখিদেরকে Winter Migrants  এবং শেষোক্ত পাখিদেরকে Locally Migrants  পাখি বলা হয়। নিম্নলিখিত পাখিদেরকে বিভিন্ন রেকর্ডের ভিত্তিতে পরিযানবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে।

ছোট সরালি (Lesser Whistling Teal / Tree Duck – Dendrocygna javanica), বড় সরালি (Large Whistling Teal – Dendrocygna bicolor), লেন্‌জা (Pintail – Anas acuta), টিকি হাঁস (Tufted Pochard – Aythya fuligula), ভূতিহাঁস  (Common Pochard – Aythya ferina), লালচে ভূতিহাঁস (White-Eyed  Pochard – Aythya nyroca), পান্তামুখি (Shoveller – Anas clypeata), চখাচখি (Brahminy Duck – Tadorna ferruginea), রাজহাঁস (Bar Headed Goose – Anser indicus), ধূসর রাজহাঁস (Greylag Goose – Anser anser), বোঁচা হাঁস  (Comb Duck / Nakta – Sarkidiornis melanotos), নীলশির (Mallard – Anas platyrhynchos), লাল মাথা হাঁস (Wigeon – Anas penelope), লালশির (Red Crested Pochard – Netta rufina), পিয়ং হাঁস (Gadwall ­- Anas strepera), নীলপাখা (Blue Winged Teal / Garganey – Anas querquedula), পাতারী হাঁস (Common Teal – Anas crecca), বালিহাঁস (Cotton Teal – Nettapus coromandelianus) ইত্যাদি। তবে হাঁস ছাড়া অন্যান্য প্রজাতির পরিযায়ী পাখিদের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। এদের মধ্যে রয়েছে বাদামি কসাই (Brown Shrike – Lanius cristatus), সাদা খঞ্জনা (White Wagtail – Motacilla alba), সাদাকালো বড় খঞ্জনা (Large Pied Wagtail – Motacilla maderaspatensis), ধূসর খঞ্জনা (Grey Wagtail – Motacilla cinerea), হলুদ খঞ্জনা (Yellow Wagtail – Motacilla flava), চিত্রা কাদাখোঁচা (Wood Sandpiper – Tringa glareola), লিটল্‌ রিংড্‌ প্লোভার (Little Ringed Plover – Charadrius dubius), কালো মাথা জল কবুতর (Black Headed Gull – Larus ridibundus) ইত্যাদি।

আমাদের অতিথী পাখিদের একটা বড় অংশ আসে সাইবেরীয়া থেকে সেখানকার তীব্র শীত এড়িয়ে আমাদের দেশে শীতের সময়টা কাটাতে। আবার অনেকেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের হীমালয় পর্বতের পাদদেশীয় অঞ্চল থেকে শীতের তীব্রতা ও প্রজনন সহায়তার জন্য এদেশে আসে। কিছু কিছু ইউরোপীয় পাখিও এখানে আসতে মাঝে মধ্যে দেখা গেছে। তাবে আমাদের অতিথী পাখিদের একটা বড় অংশ দেশের উত্তরাঞ্চলীয় শীতের তীব্রতার হাত থেকে রক্ষা পেতে উত্তরের হওরাঞ্চল থেকে দক্ষিনের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ সমুদ্রোপকূলাঞ্চলে চলে আসে।

পাখি দেখা (Bird Watching) আজ শুধু বিদেশেই নয় আমাদের দেশেও জনপ্রিয় একটি শখ আমরা জানি যে নেচার স্টাডি ক্লাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে পাখিদেখাকে জনপ্রিয় করতে আপনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন বিষয়ে আমাদের কিছু বলুন

মি.র.ভূঁইয়া – পাখি দেখা বহু দেশেই একটি অতি উন্নত মানের সুস্থ বিনোদন। আপনি জানেন যে, মানুষকে সমাজে ভালভাবে বাঁচতে হলে কিছু না কিছু বিনোদনের (Entertainment) প্রয়োজন আছে। বিনোদন আমাদের দৃষ্টিতে দুধরনের হতে পারে, যেমন – ক. ঘরমুখো (Indoor) বা খ. প্রকৃতিমুখো (Outdoor)| আবার এর অন্য ব্যাখ্যাও হতে পারে, যেমন – ক. সুস্থ (Normal) ও খ. অসুস্থ (Abnormal)| বর্তমানে প্রচলিত অধিকাংশ বিনোদনই ঘরমুখো এবং অসুস্থ। এদের মাধ্যমে সমাজে ও পুরো জাতিতে যে বিষক্রিয়া হচ্ছে এর হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হ্‌চ্েছ প্রকৃতির কাছে চলে যাওয়া এবং নিবিড়, নিভৃতে নিবেশীত হয়ে প্রকৃতির সত্যিকারের রূপটিকে নীরিক্ষণ করা, এ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা – মোদ্দা কথা, প্রকৃতি বা প্রাকৃতিক কোন বিষয় নিয়ে মেতে উঠা এবং লেগে থাকা।

তাই এ ধরণের একটি সুস্থ বিনোদন হিসেবেই পাখি দেখাকে দেখা উচিত। ১৯৮৫ সনে আমি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডঃ আলী রেজা খাঁন-সহ এক আমেরিকান পদার্থবিদ্যার প্রফেসরকে মীরপুর বোটাটিক গার্ডেনে প্রায় ৪ ঘন্টা ধরে তাঁর পাখি পর্যবেক্ষনে সঙ্গ দিয়েছিলাম। তিনি যথেষ্ট বৃদ্ধ ছিলেন এবং তাঁর নিজস্ব বিশেষ টেলিস্কোপিক বাইনোক্যুলার ছিল। পাখি দেখার সেসন শেষ হওয়ার পর আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম যে, স্যার, আপনি তো অন্য ডিসিপ্লিনের লোক আপনি কেন পাখি দেখছেন? উত্তরে তিনি বললেন যে তাঁর ঐ একটিই হবি যার জন্য এ বৃদ্ধ বয়েসে তিনি সারা বিশ্বে ঘুরে বড়াচ্ছেন। পৃথিবীর প্রায় ৮৬০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে তাঁর প্রায় ৮০০০ প্রজাতির পাখি দেখা হয়ে গেছে; তাই বাকিগুলো দেখেই তিনি মরতে চান। আমি আবার তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি যে পাখিগুলো দেখেছেন, তাদেরকে দেখলে কি আপনি আবার চিনবেন? তিনি সোজা সাপ্টা জবাব দিলেন যে, তার দরকার তিনি মনে করেন না বা তা তাঁর পক্ষে সম্ভবও নয়; কারণ এদের অধিকাংশেরই নাম উনি ভূলে গেছেন, তবে বইতে দেখে দেখে ওদের চেহারা কিছু কিছু মনে রেখেছেন।

প্রিয় পাঠক, এভাবেই আমাদেরও পাখি দেখাকে নেয়া উচিৎ। আমাদের অবসরগুলোকে ঘরে এবং বাইরে আমরা ভাগ করে নিতে পারি এবং বাইরে গিয়েও আমরা করার মত কিছু পাই না, কারণ আমরা তেমন কিছু জানিও না। একজন বাইরের লোক (ফরেনার) বন্ধের দিনে তা পুরো ফ্যামিলি নিয়ে লঙ ড্রাইভ বা পিকনিকে যায়, বা সে একা হলে লম্বা পথ পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করে আসে – ওরা বলে হাইকিং। তাছাড়া অনেকেই আমরা ফটোগ্রাফী করতে পারি, ছবি আঁকতে পারি এবং ঠিক একই ভাবে পাখিও দেখতে পারি। এখন বলবেন যে আমিতো পাখি চিনি না। তা ঠিক আপনি পাখি চেনেন না বা আপনার কাছে পাখি দেখার উপযোগী কোন ছবিযুক্ত বই বা দূরবীন যন্ত্রও নেই। তারপরও আপনাদের সদয় জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, বর্তমানে আমাদের মত ক্লাব বা সোসাইটি থাকতে এটা কোন সমস্যাই না। আপনি একটু তালাশ করলেই দেখতে পাবেন যে বর্তমানে বেশ কিছু সংস্থা হয়ে গেছে যারা আপনাকে প্রায় বিনা মূল্যেই পাখি দেখাতে নিয়ে যাবে। তবে আমরা যখন এসব শুরু করেছিলাম, সেই ১৯৮৪ সনের দিকে তখন এ ব্যাপরটা হস্যস্পদই ছিল বলতে গেলে। তবে আমাদের অসংখ্য সদস্য এবং যারা এখান থেকে যাওয়ার পরে আরও বৃহত্তর পরিসরে এ বিষয়ে আরও চর্চা করেছে বা করে যাচ্ছে, তাদের সুবাদে এ বিষয়টি বর্তমানে জনগণের কাছে আদৃত বিষয়াদির মধ্যে একটি।

অতিথি পাখিরা দীর্ঘ ভ্রমণের সময় কিভাবে পথের দিকনির্দেশনা পায় ?

মি.র.ভূঁইয়া – এ বিষয়ে বহু গবেষণা ইতোমধ্যে হয়েছে এবং বর্তমানে এগিয়ে চলেছে। পাখিদের পায়ে রিং বেঁধে বা টেগ লাগিয়ে অথবা আরও অধূনা তাদের গায়ে সোনোর ডিভাইস ইমপ্রেগনেট করেও এ গবেষণা করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে এ গবেষণা দুটি ধারা ধরে আগাচ্ছে, যেমন – ক. সোনোর ট্রেকিং মেথড ও খ. সেটেলাইট ট্রেকিং মেথড।

সোনোর ট্রেকিং হচ্ছে সনাতন পদ্ধতি এবং এতে কম্পিউটরের ব্যবহার নাই বললেই চলে। এতে প্রয়োজন একটি ট্রেকিং যন্ত্র এবং এতে গবেষকদেরকে পাখিদের সাথে সাথে পুরো রাস্তাই বেশ দ্রুততার সাথে পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু বর্তমানের সেটেলাইট পদ্ধতি এ ধারনা সম্পূর্ন বদলে দিয়েছে। এর মাধ্যমে মাত্র একটি বাগ বা রেডিও ট্রেকার তাও আবার কপালের টিপের আকৃতির, পাখির গায়ে কোন ভাবে লাগিয়ে দিতে পারলেই যথেষ্ট। কারণ সেটেলাইট ও কম্পিউটরের সুবাদে এমন সূক্ষ্ম কোন স্থান নেই যেখানে কোন ব্যক্তি বা প্রাণিকে ট্রেকিং করা সম্ভব নয়।

যাই হোক এসব গবেষণার মাধমে এটিই প্রতিয়মান হয় যে, পরিযায়ী পাখিরা শুধুমাত্র যে খাদ্যের জন্য এত পথ পাড়ি দেয় তা নয়, বরং তাদের যেটি বেশী প্রয়োজন তা হচ্ছে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি। বিজ্ঞানীরা বলেন, এদের এতদূর পথ ঠিক একই রুটে নির্দিষ্ট কাল পর পর পাড় হওয়া আজও সত্যিই এক বিশাল অজানা রহস্য। তবে বিশ্বাস করা হয় যে তারা তাদের এ মাইগ্রেশনে সম্ভবত কোন ধরণের জিও-ফিজিক্যাল সিগনেল ব্যবহার করে থাকে। এটি তারা কোন দলকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রেও করে থাকে। দেখবেন যখন একদল সড়ালী (বাংলাদেশী বুনো হাঁস) কোন পথ পাড়ি দেয় তখন এক বিশেষ ধরণের শব্দ করতে থাকে। একটি পাখি পুরো দলটিকেই নেতৃত্ব প্রদান করে থাকে এবং তার সিগনেলের সাথে সাথে তার সাথীরাও বিশেষ অন্যধরণের সিগনেল পাঠাতে থাকে বা আওয়াজ করতে থাকে। এটি দিয়ে তারা সম্ভবত তাদের রুটের উচ্চতা (Altitude)  ও নির্ণয় করে। কারণ অনেক পাখিকে দেখা গেছে মাটি হতে ৩০০০ -৩৫০০ ফিট উপর দিয়ে রাতের বেলায় মাইগ্রেট করে। তবে কিভাবে তারা তাদের দিক নির্ণয় করে এবং সঠিক গন্তব্যে পৌঁছায় তা এখনো অজানা।  তবে খুব বেশি উঁচু পাহাড়-পর্বতের বাধা না থাকলে পাখিরা সাধারনত মাটি থেকে ৪০০ মিটারের ভিতরেই বেশি ওড়ে যায়। মাটি থেকে ৯০০ মিটার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়াও একটি বিরল ঘটনাই ধরতে হবে। তবে কোন কোন প্রজাতি মাটির সামান্য ওপর দিয়ে – বিশেষত সমুদ্রের পানির সামান্য ওপর দিয়ে উড়ে যায়। তবে অতি সমপ্রতি কিছু কিছু পাখি মাটি থেকে ৭৫০০ মিটারেরও বেশি উঁচুতে উড়ে গেছে – এমন অবিশ্বাস্য ঘটনাও রাডারের সাহায্যে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অনেকে বলেছেন যে, তাদের মাস্তিষ্কের যে ম্যগ্নেটিক ফিল্ড আছে তার সাথে উত্তর বা দক্ষিণ মেরুর পোলার মেগ্নেটিজমকে তারা কাজে লাগিয়ে তাদের দিক নির্ণয় করে। তবে পাখিদেরকে ঠিক একই জায়গায় প্রতিবছর না এসে এর আসপাশে এসেও নামতে দেখা যায়।

যেমন উদাহরণ সরুপ আমাদের বরিশাল, ভোলা বা হাতিয়ার চরগুলোর কথাই ধরা যাক। প্রতি বছর একই চরে একই ধরণের পাখিরা কিন্তু আসে না। বরং তা বছর বছর পরিবর্তন হতে দেখা যায়। এসব পাখি কোন কোন ক্ষেত্রে অনেক ভিতরে এমনকি সুনামগঞ্জের বা নেত্রকোনার হওর অঞ্চলেও চলে আসে। সম্ভবত তাদের মস্তিষ্কে এমন কিছু আছে যা তাদেরকে এসব অঞ্চলের সুবিধা বা অসুবিধাদি বুঝতে অনেক উপর হতেই সাহায্য করে থাকে।

এদের গতিবেগ  ও উচ্চতা প্রজাতি ও আবহাওয়ার ভিত্তিতে বিভিন্ন হতে পারে। যেমন, পাতিহাঁস বা রাজহাঁসের জাতীয় পাখিদের গতিবেগ ঘন্টায় ৬৫ – ৮০কি.মি. বা একটু বেশি। আবার এরা দিনে-রাতে একটানা ৬-১০ ঘন্টা ওড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে – জলপিপি (Coot) একটানা ৬ ঘন্টায় প্রায় ২৫০ কি.মি., সারস (Stork) ৬ ঘন্টায় প্রায় ২০০ কি.মি., উডকক্‌ (Woodcock) ১১ ঘন্টায় প্রায় ৪০০-৪৮০ কি.মি এবং প্লোভার (Plover) ১১ ঘন্টায় প্রায় ৮৮০ কি.মি. পথ অতিক্রম করতে পারে।

দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় অতিথি পাখিরা কি ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন ?

মি.র.ভূঁইয়া – আপনারা জানেন যে পৃথিবীর এমন কোন জায়গা খালি নেই যেখানে কোন না কোন উদ্ভিদ বা প্রাণী কোন না কোন খাদ্য শৃঙ্খল (Food Chain) বা খাদ্য জ্বালিকার (Food Web) অংশ নয়। প্রতিটি খাদ্য শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তর কোন না কোন উদ্ভিদ বা প্রাণী দখল করে আছে, যাকে বলা হয় ট্রফিক লেভেল (Trophic Level)| প্রতিটি শৃঙ্খল শুরু হয় কোন উদ্ভিদকে দিয়ে যা উৎপাদক (Producer) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে – বাকী সবগুলো স্তরই কোন না কোন প্রাণির দখলে, যা খাদক (Consumer) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যায়। অতএব, খাদ্য শৃঙ্খলের প্রতিটি জীব একে অপরের সাথে খাদ্য খাওয়া বা অপরের খাদ্যে পরিণত হওয়ার বিষয়ে সম্পর্কীত। আর প্রতিটি জীব যে একটি মাত্র খাদ্য শৃঙ্খলের সাথে জড়িত তা নয়, বরং প্রতিটি জীবই তাদের খাদ্যের চাহিদা ও সুবিধা অনুযায়ী একাধিক খাদ্য শৃঙ্খলের সাথে জড়িত – যার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে খাদ্য জ্বালিকা। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রতিটি অঞ্চলের সকল খাদ্য শৃঙ্খল ও জ্বালিকাকে অটুট রেখে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে দেয় খুবই জরুরী।

তাই আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, অতিথি পাখিরাও কোন না কোন অঞ্চলের এবং আমাদের অঞ্চলেরও কোন না কোন খাদ্য শৃঙ্খল বা খাদ্য জ্বালিকার অংশ। বহুযুগ আগে থেকে তাদের এ পরিযানবৃত্তি (Migration) চলে এসেছে এবং ঐ সময় তাদের পূর্বপুরুষদের কোন একজনকে এখানকার কোন একটি প্রজাতিকে তার ট্রফিক লেভেল থেকে সরিয়েই তার স্থান দখল করতে হয়েছে (Invation) এবং তাকে তার লেভেলে টিকে থাকতে প্রচুর প্রতিকূলতা (Struggle) মোকাবেলা করতে হয়েছে। বর্তমানে তার উত্তরসূরীরা সে আসনে সমাসীন এবং সেই খাদ্যশৃঙ্খল বা জালিকার সেই ট্রফিক লেভেলটি তার জন্যই সুনির্দিষ্ট। আর যেহেতু প্রতিটি অতিথি পাখিই বছরের সুনির্দিষ্ট সময়ে তার সুনিদিষ্ট স্থানে আসা-যাওয়া করে, ঐ স্থানের ট্রফিক লেভেলগুলোও সেভাবেই নির্মিত। এখন কেউ যদি ঐ স্থানটি দখল করতে চায় তাকেও ঐ একই ভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ধীরে ধীরে ঐ স্থানটি দখল করে নিতে হবে – যা হঠাৎ করে কখনোই সম্ভব নয়। তদুপরি সবসময়ই আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, যদি কোন ভাবে হঠাৎ করে কোন নতুন প্রাণী প্রজাতি কোন স্থানে ছেড়ে দিয়ে বা গাছের চারা রোপন করে সেখানে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়, তাতে উপকারের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশী। আর ঠিক একই ভাবে যদি শিকার বা অন্য কোন পদ্ধতির মাধ্যমে কোন নির্দিষ্ট প্রাণিকে বা উদ্ভিদকে কোন স্থান থেকে সম্পূর্ণ বা প্রায় উজার করে ফেলা হয় – তাহলে সেখানকার খাদ্য শৃঙ্খলটি সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙ্গে পড়ে এবং এর সাথে জড়িত খাদ্য জ্বালিকা এবং সার্বিক ভাবে পুরো অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে (Eco-System) এর স্থায়ী বা অস্থায়ী বিরুপ প্রভার পড়ে যা হয়তো সহজে দূর করা সম্ভব হয়ে উঠে না।

তাই মনে রাখতে হবে যে, প্রতিটি পরিযায়ী অতিথি পাখি আমাদের এলাকার কোন না কোন বাস্তুতন্ত্রিয় একক বা খাদ্য শৃঙ্খলের অংশ। তাই এরা আমাদের ক্ষতির তো প্রশ্নই আসে না বরং এদেরকে বাদ দিলে বা ক্ষতিগ্রস্থ করলে আমাদের ঐ অঞ্চলের পুরো বাস্তুতন্ত্রের উপরই এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য।

একসময় আমাদের দেশে প্রচুর অতিথি পাখি আসত কিন্তু ইদানিং অতিথি পাখির সংখ্যা দিনকে দিন কমে আসছে এর কারণ কি বলে আপনি মনে করেন ?

মি.র.ভূঁইয়া – আমাদের একটু আগের আলোচনা থেকে এটিই প্রতিয়মান হয় যে, আমাদের এ পরিবেশ-সমৃদ্ধশালী দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ এবং গাঙ্গেয় অববাহীকা হওয়ার সুবাদে সর্বদাই প্রাণিসম্পদ বিশেষকরে পাখিসম্পদে সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমনে বেশ কয়েক দশক থেকেই এসব সম্পদ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার মাত্রা অতিক্রম করে চলেছে। তাই আমাদের বনজ সম্পদের সাথে সাথে সম্পর্কীত বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সংখ্যাও আসংঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে এবং তার সাথে সাথে অতিথী পাখির সংখ্যাও কমেছে বা তা তারা তাদের পূর্ব নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণ সরূপ ঢাকা চিড়িয়াখানার লেকে মাত্র ৫-৬ বছর আগেও এমন সময়ে পাখির চেচামেচীতে সরগরম থাকত; কিন্তু এসব স্থানীয় অতিথী পাখিরা বর্তমানে ঢাকার পীলখানার বি.ডি.আর.-এর লেক এবং জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেককে বেছে নিয়েছে।

একই ভাবে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮০তে পড়ার সময় প্রফেসর কাজী জাকের হুসেন এবং তাঁর বিখ্যাত এম.ফিল.-এর ছাত্র বর্তমানে ঢাকার জাতীয় যাদুঘরের প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগের কিউরেটর জনাব নজরুল হক, চট্টগ্রামের পাবলাখালী বনাঞ্চলে বাঁদী হাঁসের (White Winged Wood-duct) একমাত্র প্রজাতির উপর গবেষণা করেছেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরই শান্তি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অংশ হিসেবে এ বনাঞ্চলটি আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণভাবে জালিয়ে দেয়। যার ফলে বাঁদি হাঁসের ঐ একমাত্র প্রজাতিটি মালয়েশিয়ার দক্ষিন-পূর্বঞ্চলের কোন অঞ্চলে মাইগ্রেট করে। বর্তমানে আমরা এ সম্পদ থেকে বঞ্চিত।

তাই সময় সময় একই ভাবে বিভিন্ন বিরক্তির সুবাদে এবং সর্বোপরি উপযুক্ত খাদ্য ও আবাসের অভাবেই অতিথী পাখিরা তাদের আগমনস্থল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তাছাড়া বিভিন্ন ধরণের রাক্ষুসে বিদেশী মাছের চাষও এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

অতিথি পাখিদের সংখ্যা কমে গেলে পরিবেশের ওপর কি ধরনের প্রভাব পড়তে পারে ?

মি.র.ভূঁইয়া – এদেশ সংখ্যা কমে গেলে পরিবেশের উপর কি প্রভাব পড়বে তা আমাদের আগেকার আলোচনা থেকেই প্রতিয়মান হয়েছে। যে অতিথী পাখি আমাদের ইকো-সিস্টেমের যে ফুড-চেইনে অবস্থান করছে, তা খালি হয়ে যাওয়া মানেই হলো এর আগে ও পরে যারা অবস্থান করছে তাদের উপর, এমনকি তাদের বংশ বৃদ্ধির উপরও চাপ সৃস্টি করা। কারণ, এদেরকে সরিয়ে দেয়া মানেই হচ্ছে, এরা যা খায় তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, যাতে করে আবার তারা আগে যা খেত তার ঘাটতি সৃস্টি করা বা  অন্য কোন প্রাকৃতিক সমস্যার জন্ম দেয়া। আবার এদেরকে যারা খেত বা এদের উপর বা এদের ত্যাগ করা বস্তুর উপর নির্ভর করে যা গজিয়ে উঠতো বা বেঁচে থাকত তাদেরও অবসান হবে, হয়তো স্থান করে নেবে অন্য ক্ষতিকর কোন উদ্ভিদ বা তাদের সাথে জড়িত অন্যকোন ক্ষতিকর প্রাণী বা পোকা-মাকড়।

তাই একটু সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে, এ হাজার বছরের ধীরে ধীরে লালিত পদ্ধতিটি হুট করে সরিয়ে দিলে কি পরিমান অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে আমাদের সোনারগাঁও প্যান-প্যাসিফিক’ হোটেলে পরিবেশ বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে ভারতীয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর ছোট ছেলের বিধবা পত্নী ও বিশিষ্ট পরিবেশ কর্মী শ্রীমতি মানেকা গান্ধী এসেছিলেন। সে সেমিনারে আলোচনায় একথা বলা হয় যে, বাংলাদেশ রপ্তানী করে যে প্রাকৃতিক সম্পদ বিদেশে পাঠায় তার মূল্যের তুলনায় যে পরিমান কীট নাশক আমদানী করে তার মূল্য অনেক অনেক বেশী।

দেশে অতিথি পাখি সংরক্ষনের জন্য আইন আছে কিন্তু এর যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না বিষয়ে আপনার মূল্যবান কোন পরামর্শ আছে কি ?

মি.র.ভূঁইয়া – বাংলাদেশ হওয়ার পর ১৯৭৩ গৃহীত হয় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন (Bangladesh Wildlife Preservation Act-1973) যার উপযুক্ত প্রয়োগের অভাবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের এহেন বর্তমান দৈন্যদশা। একই ভাবে এর পরবর্তীতে দেশের পাখিসম্পদ ও অতিথী পাখিদের রক্ষণাবেক্ষণের নিমিত্তেও তৈরী হয়ে বেশ কিছু আইন যার প্রয়োগ অনেক সরকারী কর্মকর্তাকেও করতে দেখা যায় না। বিশেষকরে এখনকার মত শীতের শুরুতে যখনই অতিথী পাখিরা কেবলমাত্র আসতে শুরু করে – একধরণের পাখি ব্যবসায়ী এবং পাখি শিকারীদের গোষ্ঠী বিশেষভাবে কর্মচঞ্চল হয়ে পড়ে। দেশে প্রচলিত কড়া আইন আছে এবং পাখি ফাঁদের ফেলে আটকানো বা শিকার ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষনাও করা আছে। কিন্তু আইনের উপযুক্ত প্রয়োগের জন্য চাই এর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ, কর্তব্যনিষ্ঠা, দেশপ্রেম এবং সর্বোপরি প্রকৃতি প্রেম – সম্ভবত আপনারা স্বীকার করবেন যে বর্তমানে আমাদের এসবেরই দরূন অভাব। আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি নিজের ভক্ষক রূপ ধারণ করেন, তবে তো আর কিছু বলারই থাকে না। বিভিন্ন ছোট-খাট বনকর্মীর বাড়ীতে গেলেই দেখা যায় দেশের বনজ সম্পদের কি বিপুল পরিমান অসদ্ব্যবহার চলছে। আর দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় শুরু হওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে যেন বনের কাঠদের পাখা গজিয়েছে।

তাই গণচেতনা ছাড়া এদেশের প্রাকৃতিক শোভা ও সম্পদ রক্ষণাবেক্ষনের কোন বিকল্প নেই। তাই চলুন আমরা সাবাই এখন থেকে প্রকৃতি-সচেতন হয়ে চলি, দেশ ও দেশের সম্পদগুলোকে ভালবাসি।

পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন

মি.র.ভূঁইয়া – পাঠক-পাঠিকাদেরকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আর একটি কথা বলতে চাই যে, মানুষ জন্মসূত্রেই বিজ্ঞান মনষ্ক এবং প্রকৃতি প্রেমী। দেখবেন ছোট একটি বাচ্চার সামনে একটি খেলনা দিলে সে এটিকে হাতে নিয়ে দেখতে থাকে, নীরিক্ষণ করতে থাকে এমন কি ভেঙ্গে এর ভিতরে কি আছে তা দেখতে চায় – যদিও সে তার কিছুই বুঝে না বা সে কথাই হয়তো বলতে পারে না – কিন্তু জানার বিষয়ে সে কিন্তু সত্যি আগ্রহী, কারণ সে জন্মেছে বিজ্ঞান মনষ্ক হয়ে। তাই আপনাদের কাছে সবিনয়ে নিবেদন আপনাদের এ বিজ্ঞান মনষ্কতাকে আপনারা ধরে রাখুন এবং লালন করুন; একে ছড়িয়ে দিন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে, কারণ তারাই আমাদের ধ্যান ধারণার ধারক ও বাহক। এ পত্রিকাটির আগেও বি.এস.এস.-এর জনাব গাজিওর রহমান একটি বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশ করতেন – জানিনা তা এখনও আছে কি না। তবে আমাদের দেশের লোকজনের কাছে বিজ্ঞান পত্রিকার চেয়ে সিনেমার রংচঙ্গা পত্রিকাগুলোরই মনে হয় আকর্ষণ বেশী। তার কারণ সম্ভবতঃ আমাদের দেশে বিজ্ঞানকে অনেকেই বিদেশের মতো করে পড়ে না বরং নোট করে মুখস্ত করেই পড়ে; তাই বিজ্ঞানের সত্যিকারের আকর্ষণ এদেশে বেশী বোঝা যায় না। তাই আপনারা এ বিজ্ঞান পত্রিকাটি পড়ছেন এবং একে ধরে রেখেছেন দেখে খুবই উৎসাহীত বোধ করছি। তাই  আপনাদের এ বিজ্ঞান মনষ্কতার কারণে আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে আপনাদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

error: Content is protected !!